2001@dpisociety.org | +880 1716006200

সৌদি স্বপ্নের পতন

Mahmudul Hasan Raju
12 Sep 2026 • 7 views
সৌদি আরবের ধু ধু মরুভূমিতে জন্ম নেওয়া মানব ইতিহাসের সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী স্বপ্ন আজ কীভাবে একটা ট্রিলিয়ন ডলারের দুঃস্বপ্নে পরিণত হলো, তা নিয়ে ভাবলে যে কোনো বিজনেস মাইন্ডেড মানুষের মাথা ঘুরে যেতে বাধ্য। আজ আমি থিংক স্কুল চ্যানেলে নিওম প্রজেক্ট নিয়ে একটা অত্যন্ত বিস্তারিত কেস স্টাডি দেখলাম, আর এই পুরো ব্যাপারটা আমার মস্তিষ্কে এমন কিছু ক্রিটিক্যাল প্রশ্ন তৈরি করেছে, যা আমি চাইলেও ইগনোর করতে পারছি না।

আমরা যারা বিজনেস, টেকনোলজি এবং গ্লোবাল ইকোনমির ফিউচার নিয়ে সারাদিন পড়ে থাকি তাদের জন্য এই নিওম প্রজেক্টের ব্যর্থতা স্রেফ একটা খবরের কাগজের হেডলাইন বা সোশ্যাল মিডিয়ার ট্রেন্ডিং টপিক নয়। এটা একটা বিশাল বড় কর্পোরেট লেসন, যা নিয়ে হার্ভার্ড থেকে শুরু করে সিলিকন ভ্যালির বোর্ডরুমে চুলচেরা বিশ্লেষণ হওয়া উচিত।

আমার মাথায় যে প্রশ্নটা ঘুরছিল তা হলো, অফুরন্ত টাকার পাহাড় আর বিশ্বের সেরা সব থিংক ট্যাংক থাকার পরও একটা প্রজেক্ট কীভাবে এত বাজেভাবে মুখ থুবড়ে পড়তে পারে। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম, এই পুরো ম্যাক্রো ইকোনমিক ডাইনামিক্সটা আমি আমার নিজস্ব লেন্স থেকে ডিকোড করব এবং আপনাদের সামনে পুরো চিত্রটা তুলে ধরব।

মোহাম্মদ বিন সালমান যখন প্রথম এই স্বপ্নের কথা দুনিয়াকে জানান, তখন ব্যাপারটা শুধু একটা মেগা প্রজেক্টের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন একেবারে সিনেমাটিক স্টাইলে এবং চেয়েছিলেন পুরো দুনিয়াকে তাক লাগিয়ে দিতে। তিনি এমন একটা শহরের রূপরেখা দাঁড় করিয়েছিলেন, যা নিউইয়র্কের এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিংয়ের চেয়েও উঁচু হবে যার ভেতরে থাকবে উল্টানো স্কাইস্ক্র্যাপার আর তপ্ত মরুভূমির ঠিক মাঝখানে থাকবে একটা আস্ত স্কি রিসোর্ট যা সাধারণ লজিকের সম্পূর্ণ বাইরে।

আট দশমিক আট ট্রিলিয়ন ডলার বাজেটের এই প্রজেক্টের কোর আকর্ষণ ছিল, দ্য লাইন নামের একটি মেগাস্ট্রাকচার। এটি একশ সত্তর কিলোমিটার লম্বা একটা স্মার্ট সিটি হিসেবে ডিজাইন করা হয়েছিল, যা লোহিত সাগর থেকে শুরু করে তাবুকের পাহাড় পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়ার কথা ছিল। ভিজিল্যান্স আর এম্বিশনের কোনো অভাব সেখানে ছিল না। পৃথিবীর বাঘা বাঘা সব আর্কিটেক্ট ম্যাকিনজি এবং বিসিজির মতো লেজেন্ডারি কনসাল্টিং ফার্ম আর স্যাম অল্টম্যান থেকে শুরু করে ট্রাভিস কালানিকের মতো ভিশনারি টেক জায়ান্টরা ছিলেন এই প্রজেক্টের এডভাইজারি বোর্ডে।

সবার ধারণা ছিল সৌদি আরবের কাছে যেহেতু ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলারের ক্যাশ রিজার্ভ আছে, তারা ঠিকই নিজেদের অর্থবিত্ত দিয়ে এই অসম্ভবকে সম্ভব করে ফেলবে।

কিন্তু রূঢ় বাস্তবতা হলো দীর্ঘ নয় বছর পর এবং পঞ্চাশ বিলিয়ন ডলার খরচের পর, আজ দ্য লাইন প্রজেক্টের আটানব্বই শতাংশ কাজই অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে সৌদি সভরিন ওয়েলথ ফান্ডকে কনস্ট্রাকশন সাসপেন্ড করতে হয়েছে।

এই বিশাল পতনের পেছনের আসল কারণটা বুঝতে হলে, আমাদেরকে একটু গভীরে যেতে হবে এবং সৌদি আরবের ইকোনমিক ডেসপারেশনটা ধরতে হবে। অর্থনীতিতে একটা দারুণ কনসেপ্ট আছে, যাকে বলে, ডাচ ডিজিজ। কোনো দেশের একটা নির্দিষ্ট খাত থেকে যখন এত বেশি রেভিনিউ আসতে থাকে যে, অন্য কোনো শিল্প আর মাথা তুলে দাঁড়ানোর সুযোগই পায় না তখন তাকে ডাচ ডিজিজ বলা হয়।

সৌদি আরবের ক্ষেত্রে এই রোগের নাম ব্ল্যাক গোল্ড বা তেল। তেলের খনিগুলো থেকে এত বিপুল পরিমাণ টাকা আসে যে সেখানকার কোনো সাধারণ ম্যানুফ্যাকচারিং ফ্যাক্টরি বা এগ্রিকালচারাল ফার্মের পক্ষে সেই স্কেলের বেতন দেওয়া সম্ভব হয় না। এমনকি কোনো নতুন টেক স্টার্টআপও তেল কোম্পানিগুলোর মতো লোভনীয় সুযোগ সুবিধা দিতে পারে না। এর ফলে পুরো দেশের ইকোনমি একটা মাত্র খাতের ওপর ভয়ংকরভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে এবং ইকোসিস্টেম ডাইভার্সিফিকেশন পুরোপুরি থমকে যায়।

ডেটা দেখলে আপনি অবাক হবেন যে, সৌদি সরকারের মোট আয়ের পঞ্চান্ন থেকে ষাট শতাংশই আসে শুধুমাত্র তেল বিক্রি থেকে। অন্যদিকে দুবাইয়ের দিকে তাকালে দেখবেন, তাদের সরকারি আয়ের মাত্র চার শতাংশ আসে তেল থেকে, যা প্রমাণ করে তারা কতটা সফলভাবে নিজেদের ইকোনমি ডাইভার্সিফাই করেছে।

এখন অনেকেই স্বভাবতই প্রশ্ন করতে পারেন যে, সমস্যা কোথায়? সৌদি আরবের কাছে তো এখনও দুইশ সাতষট্টি বিলিয়ন ব্যারেল তেল রিজার্ভ আছে যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ষোলো ট্রিলিয়ন ডলার। তারা তো চাইলে অনন্তকাল ধরে এই তেল বিক্রি করেই রাজার হালে চলতে পারে। এখানেই আসে ফিউচারিস্টিক থিংকিং আর গ্লোবাল শিফটের আসল হিসাব।

পুরো পৃথিবী এখন রিনিউয়েবল এনার্জি ইভি এবং নেট জিরো এমোশনের দিকে পাগলের মতো ছুটছে। আগামী কয়েক দশকের মধ্যে তেলের চাহিদা প্রতিদিন আশি মিলিয়ন ব্যারেল থেকে কমে ত্রিশ মিলিয়ন ব্যারেলে নেমে আসার একটা শক্তিশালী ম্যাথমেটিক্যাল পূর্বাভাস রয়েছে।

এর মানে হলো প্রায় ষাট শতাংশ ডিমান্ড ড্রপ, যা একটা দেশের অর্থনীতি ধসিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। তার ওপর তেলের দাম সবসময় গ্লোবাল জিওপলিটিক্স অনুযায়ী ওঠানামা করে। আর এই প্রাইস ফ্লাকচুয়েশন সৌদি ইকোনমির জন্য একটা বিশাল থ্রেট তৈরি করে রেখেছে।

এখানে ফিসক্যাল ব্রেক ইভেন প্রাইস নামক একটা ম্যাট্রিক খুব ইম্পর্টেন্ট যা আমাদের বুঝতে হবে। সোজা বাংলায় বললে সৌদি সরকারকে তাদের দেশের স্কুল হাসপাতাল সাবসিডি কর্মচারীদের বেতন এবং নিওমের মতো মেগা প্রজেক্ট চালানোর জন্য তেলের দাম একটা নির্দিষ্ট লেভেলের ওপরে থাকতে হয়।

ধরা যাক সেই ব্রেক ইভেন প্রাইস হলো নব্বই ডলার।

অর্থাৎ তেলের দাম যদি নব্বই ডলারের নিচে নেমে যায় তাহলেই সরকারের বিশাল ঘাটতি তৈরি হবে এবং বাধ্য হয়ে তাদেরকে গ্লোবাল মার্কেট থেকে লোন নিতে হবে।

বিশ্ববাজারে তেলের দাম একটু কমলেই সৌদি আরবের অর্থনীতির ভিত রীতিমতো কেঁপে ওঠে। ঠিক এই জায়গা থেকেই জন্ম নেয়, ভিশন টুয়েন্টি থার্টি নামের সেই গ্র্যান্ড মাস্টারপ্ল্যান। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল তেলের টাকা ব্যবহার করে এমন সব ইনফ্রাস্ট্রাকচার আর ট্যাক্স ফ্রি পলিসি তৈরি করা, যাতে গ্লোবাল ইনভেস্টররা আকৃষ্ট হয়।

ম্যানুফ্যাকচারিং এআই স্পোর্টস ট্যুরিজম এবং এন্টারটেইনমেন্টের মতো নতুন নতুন আধুনিক সেক্টর বিল্ড করাটাই ছিল এই ভিশনের আসল উদ্দেশ্য।

আর এই কাজটা করার জন্য মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো সবসময় একটা নির্দিষ্ট প্লেবুক ফলো করে, যা ইতিহাসে বারবার প্রমাণিত হয়েছে। তারা এমন কিছু বানায় যা চরম অবাস্তব, প্রচণ্ড ব্যয়বহুল এবং দুনিয়াতে সম্পূর্ণ অদ্বিতীয়।

দুবাইয়ের বুর্জ খলিফার কথা একটু চিন্তা করুন।

এটা তৈরি করাটাও একসময় সবার কাছে নিছক পাগলামি মনে হয়েছিল। কিন্তু এই একটা মনুমেন্ট দুবাইয়ের ইকোনমিতে যে পরিমাণ রিটার্ন এনে দিয়েছে, তা ভাবলে অবাক হতে হয়।

বুর্জ খলিফা নিজে হয়তো সরাসরি খুব বেশি প্রফিট করতে পারেনি কিন্তু এর আশেপাশের দুই স্কয়ার কিলোমিটার এলাকার জমির দাম ত্রিশ থেকে পঞ্চাশ শতাংশ বেড়ে গিয়েছিল। ট্যুরিজম আর রিয়েল এস্টেট থেকে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার রেভিনিউ আসতে শুরু করে যা দুবাইকে গ্লোবাল ম্যাপে চিরস্থায়ী জায়গা করে দেয়।

প্যারিসের আইফেল টাওয়ার বা অস্ট্রেলিয়ার সিডনি অপেরা হাউসের ক্ষেত্রেও ঠিক একই ঘটনা ঘটেছিল। সৌদি আরবও ঠিক এই মডেলটাই কপি করতে চেয়েছিল। তারা ভেবেছিল এমন একটা কিছু বানাব, যা মানুষের কল্পনার বাইরে এবং সেটাই পুরো বিশ্বের নজর কেড়ে আনবে। এভাবেই নিওম সিটির বিশাল আইডিয়া জাস্টিফায়েড হয়েছিল।

কিন্তু স্বপ্ন দেখা আর সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দেওয়ার মধ্যে যে বিস্তর ফারাক থাকে সেটা নিওমের এক্সিকিউশনে গিয়ে স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। যখন প্রজেক্টের খরচ কল্পনার চেয়েও কয়েকগুণ বাড়তে শুরু করল তখন ম্যানেজমেন্ট প্রজেক্ট কাটছাঁট করার বদলে এক অদ্ভুত কর্পোরেট গেম খেলা শুরু করল।

তারা তাদের রেভিনিউ এস্টিমেট বাড়িয়ে দেখাতে শুরু করল, যাতে খরচের সাথে একটা ফলস ব্যালেন্স দেখানো যায়। একটা সাধারণ গ্ল্যাম্পিং সাইটের রেভিনিউ প্রজেকশন দুইশ ষোলো ডলার থেকে বাড়িয়ে রাতারাতি সাতশ চুরানব্বই ডলার করে দেওয়া হলো।

সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো ম্যাকিনজির মতো গ্লোবাল কনসাল্টিং ফার্ম এই ফিনান্সিয়াল মডেলগুলো ভ্যালিডেট করেছিল। যদিও তারা পরবর্তীতে কোনো ধরনের ম্যানিপুলেশনের কথা অস্বীকার করেছে, কিন্তু পুরো ব্যাপারটা কর্পোরেট গভার্নেন্স এবং এথিক্সের জন্য একটা বিশাল রেড ফ্ল্যাগ। এখানে কেউ হয়তো সরাসরি মিথ্যা বলছিল না, কিন্তু সবাই এক ধরনের ওভার অপটিমিজমের ঘোরে আটকে ছিল।

আর এই অপটিমিজমের কাল্পনিক বেলুনটা ফুটো হয়ে যায়, যখন তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে আসলেই কমতে শুরু করে। দুই হাজার পঁচিশ এবং ছাব্বিশ সালের বেশিরভাগ সময় তেলের দাম ছিল ষাট থেকে সত্তর ডলারের আশেপাশে, যেখানে তাদের দরকার ছিল নব্বই ডলার। ফলে শুধুমাত্র ছাব্বিশ সালের প্রথম প্রান্তিকেই সৌদি সরকারকে তেত্রিশ দশমিক পাঁচ বিলিয়ন ডলারের বিশাল বাজেট ঘাটতির মুখে পড়তে হয়।

আরামকো তাদের ডিভিডেন্ড আটত্রিশ বিলিয়ন ডলার কমিয়ে দিতে বাধ্য হয় এবং নিওম প্রজেক্ট হঠাৎ করেই চরম ক্যাশ ক্রাঞ্চে পড়ে যায়। এর পরপরই বিখ্যাত ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল নিওমের ভেতরের অডিট রিপোর্ট ফাঁস করে দেয়। বেরিয়ে আসে ম্যানেজমেন্টের ডেলিবারেট ম্যানিপুলেশন এবং কর্পোরেট পলিটিক্সের গল্প।

অবাস্তব বিজনেস প্ল্যান আর স্ফীত রেভিনিউ নাম্বারের পেছনের নগ্ন সত্যটা দুনিয়ার সামনে চলে আসে। বাধ্য হয়ে দুই হাজার ত্রিশ সালের পপুলেশন টার্গেট পনেরো লাখ থেকে কমিয়ে মাত্র তিন লাখে নামিয়ে আনা হয়। একশ সত্তর কিলোমিটারের দ্য লাইন প্রজেক্টকে নির্মমভাবে কাটছাঁট করে মাত্র দুই দশমিক চার কিলোমিটারে নামিয়ে আনা হয়। আর শেষমেশ কনস্ট্রাকশন পুরোপুরি বন্ধ করে সাইট প্যাক আপ করে ফেলতে হয়, যা আধুনিক প্রকৌশল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডিগুলোর একটি।

এই পুরো ঘটনাটা আমাকে একজন এনালিস্ট হিসেবে অনেকগুলো রিয়েলিটি চেক দিয়েছে, যা আমি আপনাদের সাথে শেয়ার না করে পারছি না। আমি পার্সোনালি মনে করি, যেকোনো লিডারশিপ বা কর্পোরেট স্ট্রাকচারের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো সত্য শুনতে না চাওয়ার মানসিকতা। নিওমের ভেতরে যে ম্যানেজার খরচের এস্টিমেট নিয়ে লজিক্যাল প্রশ্ন তুলেছিলেন তাকে নির্মমভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। যারা ম্যাথ এবং ডেটা দিয়ে প্রজেক্টের ভায়াবিলিটি চ্যালেঞ্জ করেছিল, তাদেরকে সাইডলাইন করা হয়েছিল। এটা যেকোনো টিমের জন্য একটা নীরব ঘাতক।

একটা অর্গানাইজেশনাল সিস্টেম কতটা হেলদি তা মাপা যায় সেই সিস্টেমের সবচেয়ে পাওয়ারফুল মানুষটাকে মুখের ওপর আপনি ভুল করছেন এই কথাটা বলার স্বাধীনতা থেকে। আপনি যদি একজন ফাউন্ডার, সিইও বা ম্যানেজার হন তবে আপনাকে নিশ্চিত করতে হবে যে আপনার টিমে ব্যাড নিউজ শেয়ার করার জন্য কাউকে শাস্তি পেতে হয় না। ইয়েস ম্যান দিয়ে হয়তো সাময়িক ইগো বুস্ট করা যায়, কিন্তু লং রানে সেটা পুরো প্রজেক্ট ধ্বংস করে দেয়।

দ্বিতীয় যে পয়েন্টটা আমাকে গভীরভাবে ভাবিয়েছে তা হলো এনাউন্সমেন্ট আর এচিভমেন্টের মধ্যকার কনফিউশন। স্মার্ট সিটি, বুলেট ট্রেন বা মেগা প্রজেক্টের গ্র্যান্ড এনাউন্সমেন্ট দেওয়াটা হচ্ছে লিডারদের জন্য সবচেয়ে সহজ কাজ। চকচকে থ্রিডি রেন্ডার, সিনেমাটিক মিউজিক আর এনিমেশন দিয়ে দুনিয়াকে খুব সহজেই তাক লাগিয়ে দেওয়া যায়। কিন্তু মাটির নিচে জটিল পাইপলাইন বসানো, সাপ্লাই চেইন মেইনটেইন করা লেবার ম্যানেজমেন্ট আর কন্টিনিউয়াস ফান্ডিংয়ের জোগান দেওয়ার মতো আনগ্ল্যামারাস কাজগুলোই হচ্ছে আসল চ্যালেঞ্জ।

যারা মার্কেটিং আর পিআর ক্যাম্পেইনকে আসল এচিভমেন্ট বলে ভুল করে, তারা কেবল স্বপ্নের জগতেই মনুমেন্ট বানায়, বাস্তবে তাদের হাতে কেবল মরুভূমির ধুলোই অবশিষ্ট থাকে। এক্সিকিউশন ছাড়া শুধু ভিশন থাকাটা একটা হ্যালুসিনেশন মাত্র।

আর সবশেষে যে বিষয়টা আমি সবচেয়ে ক্রুশিয়াল মনে করি, তা হলো, ক্রেডিবিলিটি বা গ্লোবাল বিশ্বাসযোগ্যতা। একটা বিশাল বাজেট হয়তো লস হলে কোনোভাবে রিকভার করা যায়। সৌদি আরবের মতো ধনী দেশের কাছে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার হয়তো কোনো বড় সমস্যা নয়। কিন্তু তারা যেটা চিরতরে হারিয়েছে, তা হলো, গ্লোবাল ইনভেস্টরদের ট্রাস্ট।

একটা পুরনো প্রবাদ আছে যে, বিশ্বাস আসে পায়ে হেঁটে কিন্তু চলে যায় ঘোড়ায় চড়ে।

পঞ্চাশ বছর ধরে সৌদি আরব কঠোর পরিশ্রম করে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছিল যে তারা বড় কিছু করতে সক্ষম। কিন্তু মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে তারা দুনিয়ার কাছে নিজেদেরকে প্র্যাক্টিক্যাল ডুয়িংয়ের বদলে, ফ্যান্টাসি ড্রিমার হিসেবে প্রমাণ করল। এই হারানো ট্রাস্ট ব্যাক করতে হয়তো তাদের একটা আস্ত জেনারেশন লেগে যাবে।

বিজনেস ইকোনমি আর ভিশনারি লিডারশিপের এই চরম পতন থেকে আমাদের সবার শেখার অনেক কিছু আছে। আমি নিশ্চিত, এই কেস স্টাডিটা আপনাদেরকেও স্ট্র্যাটেজিক চিন্তাভাবনাগুলো নতুনভাবে করতে বাধ্য করবে। আপনারা যারা নিজেদের ক্যারিয়ারে বা ব্যবসায় বড় কোনো প্রজেক্ট লিড করছেন বা ফিউচারিস্টিক কোনো উদ্যোগ নিতে যাচ্ছেন, তারা এই ডাইনামিক্সগুলো থেকে নিজেদের ডিসিশন মেকিং প্রসেস রিফাইন করতে পারেন।

আজকের এই ডিকনস্ট্রাকশনটা আপনাদের কেমন লাগল আর এই মেগা ফেইলিওর নিয়ে আপনাদের নিজস্ব পার্সপেক্টিভ বা থট প্রসেস কী, তা নিয়ে আমাকে জানাতে ভুলবেন না। সামনে এমন আরও অনেক ডিপ ডাইভ এবং ইনসাইটফুল এনালাইসিস নিয়ে আমি হাজির হবো, তাই আমার এই নলেজ ড্রিভেন কন্টেন্ট ইন্টেলিজেন্স জার্নিতে যুক্ত থাকুন এবং নতুন লেন্স দিয়ে পৃথিবীকে এক্সপ্লোর করতে প্রস্তুত থাকুন।